
শখের মেহেদি থেকে হতে পারে ভয়ঙ্কর শারীরিক সমস্যা!
মেহেদি—একটি শব্দেই যেন ফুটে ওঠে বাঙালি নারীর সাজের পরিপূর্ণতা। বিয়ে হোক বা ঈদ, পূজা কিংবা জন্মদিন—শোভা বাড়াতে মেহেদির জুড়ি নেই। শুধু নারীরা নয়, ছোট ছোট শিশুরাও আনন্দ করে মেহেদি পরতে ভালোবাসে। বাড়িতে সবাই মিলে মেহেদি পরার উৎসব যেন আমাদের সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই শখ কখনো কখনো ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, বিশেষ করে যখন ব্যবহৃত মেহেদিতে মিশে থাকে ক্ষতিকর কেমিক্যাল।
গবেষণার ভয়াবহ তথ্য
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় (জানুয়ারি, ক্লিনিক্যাল নিউরো ফিজিওলজি জার্নাল) এমন কিছু তথ্য উঠে এসেছে, যা সচেতন করার জন্য যথেষ্ট। এক ৯ বছরের শিশুর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মেহেদির গন্ধ শুঁকেই সে খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়। গবেষকরা বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাকে দ্বিতীয়বার মেহেদি পরান এবং তার প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন। গন্ধ নাকের কাছে যেতেই ২০ সেকেন্ডের জন্য শিশুটি অজ্ঞান হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেহেদির মধ্যে থাকা কিছু রাসায়নিক উপাদান স্নায়ুতন্ত্রের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও সবার ক্ষেত্রে এমন প্রতিক্রিয়া হয় না, তবুও যাদের অ্যালার্জি রয়েছে বা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের মধ্যে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কেমিক্যালযুক্ত মেহেদির ক্ষতি
বর্তমানে বাজারে যেসব রঙিন বা দ্রুত রঙ উঠা মেহেদি পাওয়া যায়, তার বেশিরভাগই কৃত্রিম রঙ ও কেমিক্যাল দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। এগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি উপাদান হলো Paraphenylenediamine (PPD), যা মূলত চুলের রঙেও ব্যবহৃত হয়। এটি ত্বকে অ্যালার্জি, চুলকানি, লালচে ভাব, ফোলাভাব এমনকি ফুসকুড়িরও সৃষ্টি করতে পারে।
শিশুদের ত্বক তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল। ফলে কেমিক্যালযুক্ত মেহেদি তাদের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, শিশু মেহেদি দেওয়ার কিছুক্ষণ পরেই কাঁদতে শুরু করে, ত্বকে জ্বালাপোড়া অনুভব করে, বা শরীরের কোথাও র্যাশ উঠে।
সাবধানতার কিছু টিপস
শখ পূরণ করতেই হবে, তবে সেটি যেন ক্ষতির কারণ না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। নিচে কিছু সতর্কতা দেওয়া হলো:
- প্রাকৃতিক মেহেদি ব্যবহার করুন: বাজার থেকে কেনার আগে মেহেদির উপাদান ভালোভাবে যাচাই করে নিন। খাঁটি প্রাকৃতিক মেহেদি সবসময়ই নিরাপদ।
- কেমিক্যালযুক্ত মেহেদি এড়িয়ে চলুন: কালো মেহেদি বা দ্রুত রঙ উঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া মেহেদি সাধারণত কেমিক্যালযুক্ত হয়ে থাকে। এসব থেকে দূরে থাকুন।
- ব্যবহারের আগে প্যাচ টেস্ট করুন: যেকোনো নতুন মেহেদি ব্যবহারের আগে হাতের এক পাশে অল্প করে লাগিয়ে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করুন।
- শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করুন: শিশুদের মেহেদি দেওয়ার আগে নিশ্চিত হোন এটি প্রাকৃতিক এবং ক্ষতিকর নয়।
- গন্ধে সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে ফেলুন: কারও মেহেদির গন্ধে মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব বা শ্বাসকষ্ট হলে, দেরি না করে হাত ধুয়ে ফেলুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
উপসংহার
শরীরের ক্ষতি করে এমন শখ কখনোই দীর্ঘস্থায়ী আনন্দ দিতে পারে না। তাই নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের সুস্থতা রক্ষা করতে মেহেদি ব্যবহারে সচেতন হওয়া জরুরি। প্রাকৃতিক বিকল্প ব্যবহার করে আপনি যেমন সুন্দর রঙ উপভোগ করতে পারবেন, তেমনি নিরাপদও থাকবেন।
সৌন্দর্যের সঙ্গে নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই এবার থেকে যখনই মেহেদি পরবেন, একটু ভাবুন—এটি কি প্রাকৃতিক? নাকি আপনার শখই হয়ে উঠবে আপনার অসুস্থতার কারণ?





Comment